ডেট্রয়েট, ৮ নভেম্বর : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দলটির ভূমিকা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগে ডেমোক্র্যাটদের বাধা না দিতে রিপাবলিকানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দ্য ডেট্রয়েট নিউজ-এর কলামিস্ট নোলান ফিনলি।
একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে ফিনলি লিখেছেন, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবের কারণে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর তাঁদের আসন হারিয়েছেন। যাঁরা এখনো আইনসভায় টিকে আছেন, তাঁদের উচিত হবে না ট্রাম্পকে নিজের পদ ধরে রাখতে সহায়তা করা।
ট্রাম্পবিরোধী জনমতের ঢেউয়ে অন্তত সাতটি আসন রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়ে ডেমোক্র্যাটদের দখলে গেছে। আরও দুটি আসনের ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।
হাতবদল হওয়া আসনগুলোর অনেকগুলোতেই ছিলেন এমন রিপাবলিকান সিনেটর, যাঁদের ট্রাম্প একসময় হুমকি দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন টেক্সাসের জন করনিন এবং নর্থ ক্যারোলাইনার থম টিলিস। ফিনলির মতে, রিপাবলিকান পার্টির (জিওপি) ভেতরে ভিন্নমতাবলম্বীদের কোণঠাসা করে ট্রাম্প দলের ওপর নিজের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ‘ব্লু সুনামি’ বা ডেমোক্র্যাটদের বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্যের ফলে সেই নিয়ন্ত্রণ এখন কিছুটা শিথিল হয়েছে।
মিশিগানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ট্রাম্প-সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ফিনলির ভাষ্য, ট্রাম্প এখন আর এমন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নন, যাঁকে ভয় পেয়ে রিপাবলিকানদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁর মতে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে রিপাবলিকান পার্টি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; তাই তাঁকে আর আনুগত্য দেখানোর প্রয়োজন নেই।
অ্যারিজোনার সাবেক সিনেটর জেফ ফ্লেক—যিনি ২০১৮ সালে ট্রাম্পের চাপের মুখে সিনেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন—সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (X) লিখেছেন, “২০১৯ সালে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আমি লিখেছিলাম: ‘অদূর ভবিষ্যতে কোনো এক দিন রিপাবলিকানরা ঘুম থেকে জেগে উঠে নিজেদের প্রশ্ন করবেন, আমরা কি এই লোকটির জন্য এসব করেছিলাম?’ আমার ধারণার চেয়ে বেশি সময় লেগেছে, তবে মনে হচ্ছে, সেই দিনটি অবশেষে এসেছে।”
ফিনলির মতে, সেই দিনটি এসেছিল ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে, যদিও তা আসতে অনেক দেরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ভয় কিংবা অন্ধ আনুগত্যের কারণে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের অসম্মানজনক আচরণ ও বেপরোয়া নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এর ফলে ভোটারদের অর্থনৈতিক দুর্দশা বেড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। এর জন্য রিপাবলিকানদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের পরিণতি থেকে তাঁকে রক্ষা করার কোনো দায় তাঁদের নেই।
ফিনলির নিবন্ধে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব বা ‘আর্টিকেলস অব ইমপিচমেন্ট’ আনতে পারেন। তবে সিনেটে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণ করতে হলে প্রয়োজন হবে ৬৭টি ভোট। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁকে অভিশংসনের দুটি প্রচেষ্টাতেই প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, এবার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে অন্তত ৫৪টি ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে অভিশংসনের পক্ষে প্রয়োজনীয় ৬৭ ভোটের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাঁদের আরও ১৩টি ভোট দরকার হবে। ফিনলির আহ্বান, রিপাবলিকানদের উচিত ডেমোক্র্যাটদের সেই ভোটগুলো দেওয়া।
এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া রিপাবলিকানদের নিজেদের স্বার্থেই মঙ্গলজনক হবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকলে তিনি দলটির ভাবমূর্তি ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকবেন। ফিনলির মতে, ট্রাম্প এতটাই একগুঁয়ে যে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে চান না, এতটাই অহংকারী যে ভুল স্বীকার করতে পারেন না। এমনকি তাঁর নিজের প্রেসিডেন্সি যে সংকটের মুখে পড়েছে, সেটিও তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন না। ২০২৮ সালের নির্বাচনেও যদি তিনি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন, তবে তা আবারও ট্রাম্পবিরোধী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করবে।
নির্বাচনের পর অনেক রিপাবলিকান নেতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও ট্রাম্পের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং তিনি মন্তব্য করেছেন, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো রাজনৈতিকভাবে তাঁর জন্য সুবিধাজনকও হতে পারে।
ফিনলির ভাষ্য, ট্রাম্প নিজের স্বার্থ ছাড়া অন্য কারও কথা ভাবেন না। তাই রিপাবলিকান দলের যেসব সিনেটর নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত, তাঁদের বিষয়টি মনে রাখা উচিত।
২০২৮ সালে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা ১৯টি সিনেট আসন নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত হবে ওই নির্বাচনেও যদি ট্রাম্পই প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠেন, তবে পরবর্তী ‘ব্লু ওয়েভ’ (ডেমোক্র্যাটদের জোয়ার)-এর ফলে সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা হয়তো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (সুপারমেজরিটি) পেয়ে যেতে পারে। তাই এখনই ট্রাম্পকে বর্জন করলে রিপাবলিকান দল নতুন করে নিজেদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারবে।
ফিনলির মতে, বর্তমানে সিনেটে থাকা রিপাবলিকানদের উচিত ট্রাম্পের অভিশংসন প্রশ্নে ভোট দেওয়ার সময় নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করা। কারণ, ট্রাম্প নিজেও সব সময় নিজের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
Source & Photo: http://detroitnews.com
নিউজটি আপডেট করেছেন : Suprobhat Michigan

সুপ্রভাত মিশিগান ডেস্ক :